আজ || শনিবার, ০৬ Jun ২০২৬
 


মনে পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদীপাড়ের রানার মানিকের কথা

সততা, আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ আর সম্পর্ক। ১৯৬৫ সাল। পাক ভারত যুদ্ধের দামামা শুরু হয়েছে। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া করি। তীর ধনুক নিয়ে লক্ষ্যভেদের প্রতিযোগিতা করতাম। মেশিনগান কামানের সামনে তীর ধনুক নিয়ে প্রশিক্ষণ এটা নস্যিরমত ও হাস্যকর বিষয় হলেও মনোবল বৃদ্ধির মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। এই কাজে যে লোকটি আমাকে সাথে নিয়ে যেতেন তিনি ছিলেন রানার বা ডাকহরকরা মানিক শেখ।এটি ছিল তার সাথে আমার সম্পর্কের বিষয়।

বিখ্যাত উপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির পদ্মা পাড়ের কুবে নন। তিনি হলেন ব্রহ্মপুত্র পারের মানিক। সে সময় দেওয়ানগঞ্জ থেকে বকশীগঞ্জ প্রায় ১৩ কিলোমিটার পথ। এই দীর্ঘ পথ ব্রহ্মপুত্রের পুরো শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে সপ্তাহের ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন তেরো তেরো মোট ছাব্বিশ কিলোমিটার পথ আসা যাওয়া করতেন সুঠাম দেহের অধিকারী সেই মানিক ভাই। আমার ধারণামতে তখন তার বয়স চল্লিশের কোঠায়। বর্ষায় তার জন্য কষ্টটা কিছুটা লাঘব হত কিন্তু হেমন্ত শীতে তার কষ্টের অন্ত ছিল না, কারণ বকশীগঞ্জ থেকে মেরুরচর, মেরুরচর থেকে দেওয়ানগঞ্জ এই পুরো রাস্তা ব্রহ্মপুত্রের উত্তপ্ত বালিতে পায়ে হেটে তিনটি খেয়া পার হয়ে  ঘর্মাক্ত শরীরে বকশীগঞ্জ থেকে দেওয়ানগঞ্জ আসতে হতো।

আমার স্মরণে যতটুকু মনে পড়ে কোনদিন তাকে দায়িত্ব থেকে বিরতি নিতে দেখিনি। এটি ছিল তার দায়িত্ববোধের পরিচয়। মেল ব্যাগটি দেওয়ানগঞ্জ পোস্ট অফিসে রেখেই আমার মরহুম মাতা শামসুন্নাহার চৌধুরাণীর কাছে ছুটে আসতেন। মা মমতা ভরে তাকে বলতেন, ও মানিক হাত মুখ ধুয়ে খাবার আছে খেয়ে নাও। মা মানিক ভাইকে আদর যত্ন সহকারে বসে খাওয়াতেন। মাঝে মাঝে তিনি আবার সেই সূর্য নগর থেকে কাঁধে মেল ব্যাগ আর হাতে মাটির হাঁড়িতে দুধ নিয়ে আসতেন। বকশীগঞ্জ দেওয়ানগঞ্জ এলাকার দুধের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল দুধের সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর দুধের পুরু সর। মার খাদ্যাভাসের ভিতরে দুধ ছিল তার অত্যন্ত প্রিয় খাবার।

একবার মানিক ভাই আমাকে ব্রহ্মপুত্রের কোলে জেলেরা জাল ফেলেছে সেখানে নিয়ে গেলেন। ঈষদ লালচে রুপালি রংয়ের বিশাল আকৃতির একটি বেহুশ মাছ লাফাচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম মানিক ভাই এত বড় মাছ, কি নাম? বললেন বেহুশ মাছ। নিয়ে যাই স্যারেরে গিয়া কমুনে, দাম দিমু পরে। মাছের ঘের থেকে জেলেরা বেহুশ মাছটি দিয়ে দিল। বাবা পোস্টমাস্টার মরহুম ছাত্তার চৌধুরী মানিক ভাইকে বললেন বেহুশ মাছ আনছো কেন? এটাতো খাইতে একটু তুলা তুলা ভাব লাগে। আলমেরও পছন্দ হয়েছে আমারও ভালো লাগলো স্যার, তাই নিয়ে আইলাম। মা বললেন মানিক এত বড় মাছটা আনছো না খেয়ে কিন্তু যাবানা। চাচি ডাক নিয়া যাওন লাগবো দেরি হলে মানষে চিঠি পত্রের জন্য বইয়া থাকবো, খাবার থাক আরেকদিন খাওন যাবেনি। এমনই সৎ লোক ছিলেন মানিক ভাই। মা কিন্তু দ্রুত রান্না সেরে মেল ব্যাগ কাঁধে নেয়া মাত্রই তাকে জোর করে খাইয়ে দিলেন।

আমরা ছিলাম ১৯৬৫ থেকে ৬৮। তখন দেওয়ানগঞ্জ থেকে বকশীগঞ্জের মানুষের চিঠিপত্রের আদান প্রদান ছাড়া ভাব প্রকাশের আর কোন মাধ্যম ছিল না। আর এই মানুষের খবরের বোঝাটিই বইতেন মানিক শেখ। বেতন ছিল মাত্র ৬০ টাকা। মানিক ভাইয়ের পিতা মরহুম আয়নাল শেখ, স্ত্রী সালমা, ছয় কন্যা, এক পুত্র। পুত্রের নাম সানোয়ার হোসেন তিনি দেওয়ানগঞ্জের পৌর এলাকায় বসবাস করেন।

মানিক শেখের একমাত্র পুত্র সানোয়ার হোসেন, দেওয়ানগঞ্জ বাজার, জামালপুর।

১৯৮৪ সনের জানুয়ারিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। শৈশবে আমার দেখা মানিক ভাইয়ের মত একজন দায়িত্বশীল, কর্মঠ, সৎ ও আন্তরিক মানুষ এখন কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে?

 

লেখক পরিচিত :

মো. শামছুল আলম চৌধুরী

অতিরিক্ত সচিব (অব) ও বিশেষ সংবাদদাতা, গোপালপুর বার্তা।

মন্তব্য করুন -


Top
error: Content is protected !!