আজ || সোমবার, ০১ Jun ২০২৬
শিরোনাম :
 


অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন কৃষ্ণাদের প্রতি গোপালপুর বার্তা’র শুভেচ্ছা

জয়নাল আবেদীন :  পশ্চিমে ঝিনাই নদী আর পূর্বে বির্স্তীন ডগাবিল। মাঝে গড়ে উঠা গ্রাম গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়া। গ্রাম ভেদ করে চলে গেছে মুশুদ্দী-ঝাওয়াইল সড়ক। এ সড়কের শতাব্দী প্রাচীন বট গাছ বায়ে রেখে একশ গজ সামনে এগুলে চারচালা টিনের বাড়ি। তাতে দারিদ্রের ছাঁপ স্পষ্ট। তবু এ বাড়িকে ঘিরেই এলাকাবাসির কৌতুহল আর উচ্ছাস। কারণ এ বাড়ির মেয়ে কৃষ্ণা মহিলা ফুটবলে বিশ্ব জয় করেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজে ছবি ছাপা হচ্ছে। টেলিভিশনের পর্দায় তার হাস্যোজ্জোল মুখ দেখা যাচ্ছে। উপজেলা সদর থেকে সাত কিলো দূরে নিভৃত পল্লীর দরিদ্র পরিবারের কৃষ্ণার এ সাফল্যে পড়শিরা যতটা না বিস্মিত তার চেয়ে বেশি উচ্ছসিত। সম্প্রতি এএফসি অনূর্ধ্ব ১৬ নারী বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কৃষ্ণা বাড়ি এলে তাকে এক নজর দেখার জন্য  মানুষের ঢল নামে।

এ টিমে ময়মনসিংহের কলসিন্ধুরের মেয়েরা গ্রামে ফেরার পথে বাসে যখন নাস্তানাবুদ হয় অথবা তাদের অভিভাবকরা অপদস্ত হয়ে থানা পর্যন্ত মামলা গড়ায় তখন কৃষ্ণাসহ গোপালপুরের অপর দুই ফুটবলার জোছনা ও রুমাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা দেয়া হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর সোমবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত মেয়েদের ফুটবলে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারিয়ে কৃষ্ণার দল বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর বুধবার জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন নিজ কার্যালয়ে প্রথমে সংবর্ধনা দেন। একই দিন গোপালপুর উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে ওই তিন ফুটবলারকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন  উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার, ইউএনও মাসুমূর রহমান, উপজেলা ভাইসচেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হালিমুজ্জামান তালুকদার, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোস্তফা কবীর, সূতি ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ, ক্রীড়া শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপন এবং কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব সরকার।

কৃষ্ণার মা ঝুমু সরকার জানান, তার এক ছেলে এক মেয়ে। কৃষ্ণা বড়। মেয়ের সাফল্যে তিনি গর্বিত। তিনি আরো জানান, বাল্যকাল থেকেই মেয়েটার ফুটবলের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ ছিল। গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সময় স্কুল মাঠে ছেলেদের সঙ্গে মিলে ফুটবল খেলতো। এ নিয়ে পাড়াপড়শিরা টিপ্পনী কাটতো। এক পর্যায়ে ছেলেদের সঙ্গে মিলে ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিলে কৃষ্ণা খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয়। পরে আশপাশের মেয়ে শিশুদের নিয়ে বাড়ির ছোট্র আঙ্গিনায় ফুটবল চর্চার সুযোগ দেয়া হয়। লেখাপড়ার প্রতি কিছুটা অমনোযোগি থেকে সর্বক্ষন ফুটবল নিয়ে মাতামাতি করায় একবার খেলার বল কেড়ে নিয়ে চুলায় পোড়ানো হয়। কিন্তু তাতেও কৃষ্ণাকে দমাতে না পারায় বাবা বাসুদেব সরকার হার মানেন। ২০১০ সালে বঙ্গমাতা ফজিলাতুনেচ্ছা ফুটবল টুর্নামেন্টে কৃষ্ণার নের্তৃত্বে উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাইমারি স্কুল উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। কৃষ্ণা সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ায় সূতি ভিএম মডেল পাইলট হাইস্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের নজর পড়ে। তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফের অনুমতি নিয়ে কৃষ্ণার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাকে সূতি ভিএম পাইলট হাইস্কুলে বিনা বেতনে পড়ানোর প্রতিশ্রুতিতে ভর্তি করানো হয়।

এরপর কৃষ্ণাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সূতিভিএম হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে ফুটবল চর্চার অবাধ সুযোগ পায়। এক পর্যায়ে পুরো টিমের নের্তৃত্ব পায়। জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩ সালে কৃষ্ণার নের্তৃত্বে তিন বারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয় সূতি ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুল। পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে অনূর্ধ ১৫ মহিলা ফুটবল দল গঠন করা হলে কৃষ্ণা অধিনায়ক নির্বাচিত হন। একই সাথে সূতি ভএম মডেল হাইস্কুলের আরো দুই ফুটবলার জোছনা ও রুমা জাতীয় দলে স্থান পায়। ময়মনসিংহের কলসিন্ধুরের মেয়েদের নিয়ে গঠিত হয় এএফসি অনূর্ধ ১৬ নারী ফুটবল দল। এ কিশোরী ফুটবল টিমের কোচ নির্বাচিত হন গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের বর্ণি গ্রামের সরকারি কর্মকর্তা মরহুম শাহজাহান আলীর তালুকদারের পুত্র এবং এক কালের বিখ্যাত ফুটবলার গোলাম রব্বানী ছোটন। তিনি সূতি ভএম মডেল হাইস্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের জ্যাষ্ঠ ভ্রাতা।

যাই হোক, কৃষ্ণার দল এখন তারকা ফুটবলার হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কারণ বাছাই পর্বে গত ২৭ আগস্ট ইরানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে যাত্রা শুরু। ৩ সেপ্টেম্বর শক্তিশালী চায়নীজ তাইপেকে ৪-২ গোলে, সিঙ্গাপুরকে ৫-০, কিরগিস্তানকে ১০-০ এবং সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর আরব আমিরাতকে ৪-০ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। খেলায় কৃষ্ণার দল সব মিলিয়ে ২৬ বার জালে বল পাঠায়। এর মধ্যে অধিনায়ক ও স্টাইকার কৃষ্ণা একাই করেন আটটি গোল। এর আগে গত মে মাসে তাজিকিস্তান থেকে এএফসি অনূর্ধ ১৪ মহিলা ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরে কৃষ্ণার দল। ২০১৫ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ ১৪ এএফসি রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশীপে চূড়ান্ত বিজয় মাল্য নিয়ে আসে কৃষ্ণার দল। এভাবে প্রথমবারের মতো নারী ফুটবলে ইতিহাস সৃষ্টি করে কৃষ্ণারা এশিয়ায় এএফসি কাপের মূল পর্বে ঠাঁই পায়।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে চীনে অনুষ্ঠিত হবে অনূর্ধ ১৭ বিশ্বকাপ মহিলা ফুটবল। মূল খেলায় কৃষ্ণারাসহ আটটি দল অংশ নেবে। গত বছরের চার সেমিফাইনালিষ্ট উত্তর কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ স্বাগতিক চীনের সঙ্গে খেলবে বাছাই পর্বের চ্যাম্পিয়নরা। বয়স ভিত্তিক ফুটবলে অভাবনীয় সাফল্য দেখানোর জন্য কৃষ্ণার দলকে পাঁচ তারকা হোটেলে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে পুরস্কৃত ও করা হয়েছে। বাফুফে বছরব্যাপি কৃষ্ণাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের লেখাপড়া চালানোর জন্য স্পন্সর এনেছে। এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দীন। এখন দেখার পালা প্রশিক্ষণ শেষে আগামী সেপ্টেম্বরে চীনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে কতটা লড়াই করতে পারে অজঁপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসার হতদরিদ্র পরিবারের কিশোরি ফুটবলাররা।

কৃষ্ণা গোপালপুর বার্তাকে জানান, সকলের দোয়া থাকলে আগামীতে তারা দেশের জন্য বড় সুখবর নিয়ে আসতে পারবেন বলে আশাবাদি। এ ব্যাপারে গোপালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার জানান, কৃষ্ণাদের জন্য উপজেলা পরিষদ নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। আগামীতেও এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তিনি আশাবাদি চীন থেকে বিজয়ী হয়ে কৃষ্ণারা আগামীতে দেশের মুখ আরো উজ্জল করবে।

জয়নাল আবেদীন, সম্পাদক www.gopalpurbarta24.com

মন্তব্য করুন -


Top
error: Content is protected !!