বিশেষ প্রতিবেদক : ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসের সোমবার। সারা উপজেলা জুড়ে চলছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষা। গোপালপুর পৌরশহরের সূতী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ছিল সমাপনীর বাংলা পরীক্ষা। সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন চতিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সোলায়মান সুমন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট মাসুমূর রহমান অকস্মাৎ ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে তিনি হতবাক হয়ে যান। সোলায়মান সুমনসহ কয়েকজন শিক্ষক সেখানে হাট বসিয়েছেন। বই বের করে কোমলমতি ছেলেমেয়েদের প্রশ্নের উত্তর খাতায় লিখতে সহযোগিতা করছেন। ক্ষুব্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ৬ শিক্ষককে নকলে সহযোগিতা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্র থেকে বহিঃস্কার করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বরাত দিয়ে গোপালপুর বার্তায় ‘গোপালপুরে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় নকল সরবরাহের অভিযোগে ৬ শিক্ষক বহিস্কার’ শিরোনামে খবর প্রকাশ হলে শিক্ষক সুমন ভয়ানক চটে যান। কেনো এ ধরনের খবর ছাপা হলো তার কৈফিয়ত চেয়ে মিডিয়াকর্মীদের শাসানোর অপচেষ্টা করেন।
শিক্ষক সুমনের কুকর্ম নিয়ে গত ৮ নভেম্বর গোপালপুর বার্তায় প্রকাশিত প্রথম পর্বের সিরিজ ‘গোপালপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুমনের যত অপকর্ম (১); স্কুল শিক্ষিকাকে পর্ণো ছবি পাঠিয়ে কুপ্রস্তাব’ ব্যাপক সাড়া জাগায়। কয়েক হাজার পাঠক এ খবর পড়াসহ লাইক, কমেন্ট ও নিউজটি শেয়ার করেন। কিন্তু একটি মহল সুমনের প্রতি সহানভূতি দেখিয়ে এ ধরনের নেতিবাচক খবর প্রকাশে আপত্তি জানান। এ সব খোলাশা করতেই সুমনের কুকর্ম সম্পর্কিত গোপালপুর বার্তার সিরিজ (২) এর অবতারনা।
সুমনের কর্মস্থল চতিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারী গোপালপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরবার যে লিখিত অভিযোগ দেন তার সারমর্ম তুলে ধরা হলো- ০৯/০২/১৬ ইং তারিখ স্কুলে আগমণ দুপুর ১২টা-গমন আড়াইটা, ১০/০২/১৬ ইং তারিখ আগমন ১১টা-প্রস্থান দুপুর ২টায়, ১১/০২/১৬ সকাল সোয়া ৯টায় হাজিরা দিয়ে স্কুল ত্যাগ, ১৪/০২/১৬ ইং তারিখে অনুমোদিত অনুপস্থিত, ২০/০২/১৬ ইং তারিখ সাড়ে ১০টায় আগমন ১২টায় প্রস্থান, ২৩/০২/১৬ ইং তারিখে দশটায় আগমন ১২টায় প্রস্থান। এ ছাড়াও ০৯/০১/১৬ ইং তারিখ সকাল ১১টায় স্কুল ত্যাগ করার সময় পর দিনের অর্থাৎ ১০/০১/১৬ ইং তারিখের অগ্রীম স্বাক্ষর করে যান।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার শহীদুল বিন হেলাল গত ১০/০৬/২০১৫ ইং তারিখে চতিলা বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় শিক্ষক সুমনকে অনুপস্থিত দেখতে পান। পরিদর্শন কলামে এ সর্ম্পকে সরস মন্তব্য করা হয়। ২৭/০৭/২০১৫ ইং তারিখে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্কুল পরিদর্শনের সময় সুমনের অনুপস্থিতি দেখতে পান। ০৬/০৮/২০১৬ ইং তারিখে সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার সাইফুল ইসলাম চতিলা স্কুল পরিদর্শনের সময় সুমনকে অনুপস্থিত হিসাবে মার্ক করেন।
অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, শিক্ষক সুমন বিনা কারনে শিক্ষার্থীদের অমানুষিক শাস্তি দিয়ে থাকেন। তার অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে শিক্ষা অফিসার অথবা সহকর্মী শিক্ষকদের মা-বাপ তুলে অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করে থাকে। এসব লিখিত অভিযোগ দেয়ায় প্রধান শিক্ষককে স্কুলে সুমন ছাত্রছাত্রীদের সামনে মারধোরে উদ্যত হন।
০৪/০৬/১৫ এবং ০৬/০৭/১৫ এবং ০৯/০৮/১৫ ইং তারিখে সুমন অনুমোদিতভাবে অনুপস্থিত ছিলেন বলে পরিদর্শন বহিতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে তার বিরুদ্ধে বিশ দিনের বিনানুমতিতে অনুপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে। এই যে তার খেয়াল খুশি মতো আগমন ও প্রস্থান তাতে প্রধান শিক্ষক অথবা উপজেলা শিক্ষা অফিসের কোনো অনুমোদন ছিলনা।
এসব অভিযোগ নিয়ে বেশ ক’বার তদন্ত রিপোর্ট স্কুল থেকে উপজেলায়, উপজেলা থেকে জেলা এবং ডিজিতে পাঠানো হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নাই। কেন হয় নাই সে খবর নিতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসার দশা হয়। কারণ সুমনের সহযোগি ও প্রশ্রয়দাতা ঘুষখুরদের সংখ্যাও অনেক এবং তারা খুবই প্রভাবশালী।
স্কুল কামাই দিয়ে সুমন কেনো সর্বক্ষণ উপজেলা শিক্ষা অফিসে ঘুরাঘুরি করেন তা নিয়ে সরেজমিন তদন্ত করে দেখেন স্থানীয় মিডিয়াকর্মীরা। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারি নিয়োগ, তাদের বেতনভাতা মঞ্জুর, শিক্ষকদেও বদলী, পদোন্নতি, এরিয়া বিল উত্তোলন, গ্রুপিং-লবিং এবং সব ধরনের বে-আইনী কাজের তদবীর, উৎকোচ আদায় ও প্রদানের কাজ সারেন সুমন। এ জন্য সুমন শিক্ষা অফিসের সকল কর্মকর্তাদের খুবই প্রিয়।
গত রবিবার উপজেলা শিক্ষা অফিসে কাজ নিয়ে আসা দুই প্রবীণ শিক্ষক গোপালপুর বার্তাকে জানান, শিক্ষা অফিসের ইট পর্যন্ত ঘুষ খায়। আর এ কাজের ঠিকাদারি করেন শিক্ষক সুমন। সম্প্রতি ২৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়া চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের বেতনভাতা মঞ্জুরের নামে প্রত্যেকের নিকট থেকে ২৭ হাজার টাকা করে আদায় করেন। এ ঘুষের টাকা আদায় করা হয় উপজেলা, জেলা এবং ডিজি অফিসের খরচের নামে। এ টাকা কিভাবে কার কার সাথে ভাগ হয় তার অডিও রেকর্ড সংগ্রহ করেছেন মিডিয়াকর্মীরা। ওই অডিও রেকর্ডে বলতে শোনা যায়, রাঘবোয়ালরা ৪/৫ লক্ষ টাকা করে নিয়ে এদের চাকরি দিয়েছে। এখন কেনো বেতনভাতা মঞ্জুরের জন্য আমাদেরকে ২৭ হাজার টাকা করে দেবেনা?
চাতুটিয়া উত্তরপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণের প্রক্রিয়া চলছে। ওই স্কুলে ২০১০ সাল থেকে হারুন-অর-রশীদ, শাহ আলম, কামরুন্নাহার এবং আম্বিয়া বেগম নামক চার শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। সরকারিকরণের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে ওই স্কুলের যাবতীয় কাগজপত্র ডিজিতে জমা দেয়া হয়।
সম্প্রতি সুমন উপজেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলামের বরাত দিয়ে ফরহাদ হোসেন এবং বিলকিস বেগম নামক দুই বেকারকে নতুন করে ওই স্কুলে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাত লক্ষ টাকা উৎকোচ আদায় করে।
ওই স্কুলের শিক্ষক হারুন-অর-রশীদ জানান, নতুন করে দুজন শিক্ষককে এ বিদ্যালয়ে কিভাবে নিয়োগ দেবার ব্যবস্থা করা হবে তা তার মাথায় আসছেনা। সুমন প্রভাব খাটিয়ে ওই দুই শিক্ষককে স্কুলের শিক্ষক হাজিরা খাতায় দস্তখত করার ব্যবস্থা করাচ্ছেন। এ সাত লক্ষ টাকা উৎকোচ হিসাবে উত্তোলনের বিষয়ে গত শুক্রবার চাতুটিয়া বাজারে এক সালিশী বৈঠক হয়। বৈঠকে অংশ নেয়া মাতব্বরগন এ উৎকোচ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা গোপালপুর বার্তাকে নিশ্চিত করেন।