আজ || শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
শিরোনাম :
 


“জামালপুর এক্সপ্রেস” দিক পরিবর্তন, একটি জনপ্রিয় ট্রেনের মৃত্যু

মোঃ শামছুল আলম চৌধুরী, বিশেষ সংবাদদাতা :

১৯৯৮ সালের ২৩ জুন উত্তরবঙ্গের সাথে ট্রেনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। যমুনা ব্রিজ দিয়ে অত্যন্ত ধীর গতিতে চলতো ট্রেন। তবুও তো ট্রেনে যমুনা পার হওয়া! কিন্তু বঞ্চিত হচ্ছিল টাঙ্গাইল-জামালপুরের বাসিন্দা। তারাকান্দি থেকে যমুনা ব্রিজ পর্যন্ত  রেল যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। নানান প্রচেষ্টায় তারাকান্দি থেকে ব্রিজ (ইব্রাহিমাবাদ) পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন কাজ শুরু হয়। জুন ২০১২ সালে এই লাইনে রেল চলাচল শুরু হলো। প্রথমে মেইল ও লোকাল নিয়ে দুইটি ট্রেন চলাচল করত। একটি ৩৭/৩৮ নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস, অপরটি ময়মনসিংহ-ইব্রাহিমাবাদ পর্যন্ত চলাচলকারী ৭৫ আপ ও ৭৬ ডাউন ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস। কিছুদিন পর যোগ হয় ৭৪৫/৭৪৬ যমুনা এক্সপ্রেস, এটি এখন এই রুটে চলাচল বন্ধ রয়েছে। কিন্তু তারাকান্দি-ইব্রাহিমাবাদ হয়ে ঢাকা পর্যন্ত কোনো আন্তঃনগর ট্রেন ছিল না। পুনরায় প্রচেষ্টার পালা, অতঃপর চালু হয় “জামালপুর এক্সপ্রেস’’ আন্তঃনগর ট্রেন। জামালপুর থেকে সরিষাবাড়ি, তারাকান্দি, ইব্রাহিমাবাদ হয়ে ঢাকা পর্যন্ত ২৬ জানুয়ারি ২০২০ সালে জামালপুর এক্সপ্রেস চলাচল শুরু করে। এই ট্রেনে সংযোজিত ছিল নতুন ইঞ্জিন, ১টি পাওয়ার কার, ২টি খাবার গাড়ী, ২টি এসি (স্নিগ্ধা) কোচ,  ৮টি শোভন চেয়ার কোচ এবং ১টি লাগেজ ভ্যানসহ মোট ৬২০ (ছয়শত বিশ) আসনের ১৪টি আকর্ষণীয় কোচ।


যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ হাতে নেওয়ায় ১৫ এপ্রিল ২০২৩ সালে ট্রেনটির রুট পরিবর্তন করে ঢাকা-ময়মনসিংহ-জামালপুর-তারাকান্দি-ভূঞাপুর পর্যন্ত চলাচল শুরু হয়। ফলে ঢাকা থেকে হেমনগর (ভূঞাপুর) পর্যন্ত আগে যেখানে ৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগতো, এখন লাগে প্রায় ৮ ঘণ্টা। অথচ এই ট্রেনে টাঙ্গাইল-জামালপুর ও আংশিক সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা যেমন- টাঙ্গাইল জেলাধীন এলেঙ্গা, কালিহাতি, ভূঞাপুর, অলোয়া, গোবিন্দাসী, অর্জুনা, নলিন, ফলদা, গাবসারা, নিকরাইল, গুলিপচা, হেমনগর, সোনামুই, হরিশা, ডাকুরী, মৌজা ডাকুরী, দরিশয়া, মোহাইল, ছয়ানিপাড়া, ভেঙ্গুলা, ঝাওয়াইল, গোপালপুরের সকল এলাকা এবং জামালপুর জেলার সাতপোয়া, চর শিশুয়া, চর সরিষাবাড়ী, চর জামিরা, ছাতারিয়া, বিন্যাকৈর, সাইঞ্জারপাড়, বগারপাড়, রুদ্রবয়ড়া, তারাকান্দি, পাখিমারা, চেচিয়াবাধা, পোগলদিঘা, বয়ড়া, চাপারকোনা, মহিষাকান্দি, নাথেরপাড়া, কাশিনাথপুর, কাবারিয়াবাড়ী, চাঁনপুর, তরণীআটা, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট, বাটিকামারী, দৌলতপুর, আওনা, স্থল, পিংনা, চিতলাপাড়া, রসপাল, বারইপটল, ফুলদাহের পাড়া, কাওয়ামারা, মেদুর, মেইয়া, পদ্মপুর, নরপাড়া,রাধানগর, ভাটারা, গোপীনাথপুর, বাউসী, জাফরাবাদ, শুয়াকৈর, কান্দারপাড়া, সানাকৈর, বনগ্রাম, মহাদান, গ্রামের কয়েক হাজার লোকজন জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে নিয়মিত চলাচলা করে থাকে। উপরন্ত সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর – টাঙ্গাইল জেলার চরঞ্চালের যেমন, গাবসারা (ভূঞাপুর), শুশুয়ার চর (ভূঞাপুর), গোবিন্দাসী আংশিক (ভূঞাপুর), নলসন্ধা (পিংনা), ডাকাতিয়া মেন্দা (পিংনা), বালিয়া মেন্দা (পিংনা), বাসুরিয়া (পিংনা), রূপসা (সিরাজগঞ্জ), কোনাবাড়ী (সিরাজগঞ্জ), কিনারবেড় (কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ), কাজলগ্রাম, (কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ), চন্দনপুর (কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ), অলিরচর তেঘরী (সিরাজগঞ্জ) এলাকার লোকজনও এই ট্রেনে ভ্রমণ করে থাকে। টাঙ্গাইল-জামালপুর-সিরাজগঞ্জের সমতল ও চরঞ্চালসহ প্রায় সাতলক্ষাধিক লোকের বসবাস আর এসকল জনবহুল এলাকার কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াতের সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক ট্রেন “জামালপুর এক্সপ্রেস”। ট্রেনটির রুট পরিবর্তন হওয়ায় এবং সময় বেশি লাগার কারণে এ ট্রেনের যাতায়াত বাদ দিয়ে লোকজন ভিন্নভাবে চলাচল করায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। উপরন্তু সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। এছাড়াও এই রুটে ট্রেনের যাত্রাবিরতির সময় খুবই কম। টাঙ্গাইল রেলস্টেশন থেকে যাত্রীদের ওঠানামার জন্য মাত্র দুই মিনিট সময় পাওয়া যায়, যা খুবই স্বল্প। বিরতির সময় বাড়ানোর জন্য এলাকাবাসীর দাবি রয়েছে। অপরদিকে, টাঙ্গাইল রেলস্টেশনের মূল প্ল্যাটফর্মের সাথে মাঝের প্ল্যাটফর্মের উচ্চতার পার্থক্যের কারণে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাতায়াত করা খুবই কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। যদি প্ল্যাটফর্ম ২টির মধ্যে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়, তবে যাত্রীগণ নিরাপদে প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করতে পারবে।

টাঙ্গাইল-ইব্রাহিমাবাদ-তারাকান্দি-জামালপুর রুটে আবারও এই ট্রেনটি চালু করার বিষয়ে রেলের মহাপরিচালকের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, ইব্রাহিমাবাদের সিগন্যালিং সিস্টেম চালু না হওয়ায় টাঙ্গাইল-ইব্রাহিমাবাদ হয়ে জামালপুর এক্সপ্রেস চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে এই রুটে ট্রেনটি চালানো যাবে বলে আশা করা যায় । এখন দেখা যাক টাঙ্গাইল-জামালপুর এলাকাবাসির পছন্দের জনপ্রিয় “জামালপুর এক্সপ্রেস” কবে নাগাদ আবারো টাঙ্গাইল-ইব্রাহিমাবাদ-ভূঞাপুর-তারাকান্দি-জামালপুর পর্যন্ত পুনরায় চলাচল করে।

লেখক পরিচিত :


মোঃ শামছুল আলম চৌধুরী, অতিরিক্ত সচিব (অব:) এবং বিশেষ সংবাদদাতা, গোপালপুর বার্তা

মন্তব্য করুন -


Top
error: Content is protected !!